রসালো ফল তরমুজে ছেয়ে গেছে বরিশালের বাজার। গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর বরিশাল বিভাগে তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে। ভালো ফলনে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন কৃষকরা।
কৃষি বিভাগ জানায়, পাঁচ বছরের ব্যবধানে দক্ষিণাঞ্চলে তরমুজের আবাদ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। কৃষক যাতে ভালো দামে তরমুজ বিক্রি করতে পারে সে লক্ষ্যে কাজ করছে কৃষি বিভাগ।
সরেজমিনে দেখা যায়, তরমুজ বোঝাই বড় বড় ট্রলার এসে ভিড়ছে বরিশালের ঘাটে। ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী থেকে কৃষক ও ব্যাপারীরা মাঠ থেকে তুলে সরাসরি ট্রলারে করে বিক্রির জন্য নিয়ে এসেছেন বরিশাল নগরীর পোর্ট রোডের সাত তলা ঘাট ও পোর্ট রোড বালুর ঘাটে। সেখান থেকেই ব্যাপারী ও আড়তদাররা ট্রাকযোগে পাঠিয়ে দিচ্ছেন দেশের নানা প্রান্তে। গত বছরের তুলনায় এ বছর চিত্রটি একটু ভিন্ন। বরিশাল বিভাগে এ বছর তরমুজের উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ।
ভোলার তরমুজ চাষি বারেক ভুঁইয়া বাসসকে বলেন, আমি সাড়ে তিন একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। এতে আমার ৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তরমুজের উৎপাদন ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারে তরমুজের দাম আগের চেয়ে কম।
কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, আমাদের অনেক তরমুজ উৎপাদন হয়েছে। আশা করি ভালো দামে বিক্রি করতে পারবো। এ বছর তরমুজ চাষে আমাদের প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।
তরমুজ চাষি সুরুজ আলী বলেন, আমার জমিতে তরমুজের ফলন ভালো হয়েছে। শিলা বৃষ্টি হওয়ায় কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু তারপরও আশা করছি লাভবান হব।
দেশের বিভিন্ন জেলার ফল ব্যবসায়ীরা বরিশালে কৃষক ও আড়তদারদের কাছ থেকে তরমুজ কিনতে আসছেন। এ বছর তরমুজের উৎপাদন নিয়ে তারা সন্তুষ্ট। চলতি মৌসুমে ভোক্তাপর্যায়ে আকার ভেদে তরমুজ বিক্রি হচ্ছে ১৫০-৫০০ টাকায়।
ময়মনসিংহের তরমুজ ব্যবসায়ী শহীদুল বলেন, এবার যে সব কৃষক তরমুজ আবাদ করেছে তাদের সবারই তরমুজের আবাদ ভালো হয়েছে। ট্রলার বোঝাই করে তারা তরমুজ নিয়ে আসছেন। এই তরমুজ আমরা সিলেট অঞ্চল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা ও টাঙ্গাইল জেলায় পাঠিয়ে দিচ্ছি।

বরিশালের পোর্ট রোড, মৎস্য আড়ত থেকে শুরু করে সর্বত্রই সবুজ রঙের রসালো ফল তরমুজে ভরপুর। সারি সারি তরমুজ সাজিয়ে রাখা হয়েছে আড়তগুলোতে। বর্তমানে আড়তগুলোতে তরমুজের আকার ভেদে প্রতি ১০০ টি তরমুজ ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ভালো মানের বড় তরমুজ বিক্রি হচ্ছে প্রতি শ’ ২০ হাজার টাকায়।
নগরীর বালুর ঘাট তরমুজ আড়তের আড়তদার খাজা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, এ বছর তরমুজের ফলন খুবই ভালো হয়েছে। ২০- ৩০ হাজার টাকা শতক বিক্রি করেছি। ছোট আকারের তরমুজ ১০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
বরিশাল ফল আড়তদার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান জাকির বাসসকে বলেন, ঘাটে তরমুজ আনার পর আমরা সেগুলোর মান যাচাই করে দরদাম করে বিক্রি করি। আবার অনেকে আমাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে জমি চাষ করে। তারাও তাদের উৎপাদিত তরমুজ আমাদের কাছে নিয়ে আসে।
বরিশাল কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্য পরিবহনে নতুন পথ খুঁজছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। কৃষক যাতে ভালো দাম পায় সে ব্যাপারে তারা কাজ করছেন।
বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোহাম্মাদ নজরুল ইসলাম সিকদার বলেন,
এখানে মধ্যস্বত্বভোগী রয়েছে। উৎপাদিত তরমুজ সারাদেশে পরিবহণের জন্য কৃষক রিস্ক নিতে চায় না। তাই মধ্যস্বত্তভোগী এসে পড়ে। পাইকাররা ক্ষেত থেকে কিনে নিয়ে যায়। তবে পাইকার যেহেতু বেশি আসছে তাই দর কষাকষির মাধ্যমে কৃষক ভালো দাম পাচ্ছে। কৃষক যাতে ভালো দাম পায় আমরা সে বিষয়টি দেখছি।
কৃষি বিভাগ জানায়, পাঁচ বছরের ব্যবধানে দক্ষিণাঞ্চলে তরমুজের আবাদ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২১-২২ অর্থ বছরে বরিশাল বিভাগে তরমুজ আবাদ হয়েছিল ৪৬,৪৫১ হেক্টর জমিতে। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে যা দাঁড়িয়েছে ৭০,৩৬২ হেক্টর। এর আগে ২০২৪-২৫ সালে ৫৪,৫৫১ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ করা হয়।
বরিশাল কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক এসএম মাহবুব আলম বাসসকে বলেন, আগে আমাদের ধারণা ছিল তরমুজ শুধু উত্তরাঞ্চলে হয়। কিন্তু ইদানীং আমাদের দক্ষিণাঞ্চলের চরগুলোতে, বিশেষ করে ভোলা ও পটুয়াখালী অঞ্চলে অনেক তরমুজ হয়। এখানে প্রায় বিশ লাখ মেট্রিক টন তরমুজ উৎপাদিত হয়। এখন পর্যন্ত যে উৎপাদন হয়েছে তার চেয়ে আরও বেশি উৎপাদন হবে বলে আমরা আশাবাদী।
বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় চলতি মৌসুমে তরমুজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬২ হাজার ৬২৬ হেক্টর জমিতে। তবে মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই সেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৭০ হাজার ৩৬২ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়। এতে অগ্রগতির হার দাঁড়াচ্ছে ১১২ দশমিক ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে তরমুজের চাষ বেড়েছে।
সূত্রঃ বাসস