২০২৫ সালের বিক্ষোভ দমনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলায় নেপালের আদালত সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি ও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আটকাদেশ আরও পাঁচ দিন বাড়িয়েছে।
কাঠমান্ডু থেকে এএফপি জানায়, রোববার কাঠমান্ডু জেলা আদালত এই সিদ্ধান্ত দেয়। তথ্য কর্মকর্তা দীপক কুমার শ্রেষ্ঠ এএফপিকে বলেন, ‘আদালত পাঁচ দিনের বর্ধিত সময় অনুমোদন করেছে।’
৭৪ বছর বয়সী ওলি এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককে শনিবার ভোরে গ্রেপ্তার করা হয়। তার একদিন আগে প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ শপথ নেন, যা সেপ্টেম্বরের গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনের ফল।
বিক্ষোভ দমনে তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, যেখানে অন্তত ৭৬ জন নিহত হয়। তবে এখনো তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়নি এবং দুজনই সহিংসতার দায় অস্বীকার করেছেন।
আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা পান।
রোববার ওলি হাসপাতালে থেকে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে আদালতে হাজির হন। শনিবার প্রক্রিয়াগত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ওলি হৃদরোগ ও কিডনি সমস্যায় ভুগছেন। গ্রেপ্তারের পর কড়া পুলিশ পাহারায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে এএফপি প্রতিবেদকরা দেখেছেন।
আদালতের মুখপাত্র অর্জুন প্রসাদ কৈরালা জানান, ওলি ও লেখাকের মুক্তির আবেদন নিয়ে সোমবার সুপ্রিম কোর্ট শুনানি করতে পারে।
তদন্ত কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতেই ওলি ও লেখাককে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, তারা নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি চালানো ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সহিংসতা সম্পর্কে অবগত নন, এমন দাবি করে দেওয়া তাদের বক্তব্য আসলে দায় এড়ানোর চেষ্টা এবং এটি ‘অপরাধমূলক অবহেলা’র শামিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেপরোয়া আচরণের ফলে মৃত্যুর ঘটনায় প্রযোজ্য আইনে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এদিকে, সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী দীপক খড়কাকেও রোববার অর্থপাচার মামলায় আটক করা হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর মুখপাত্র শিবা কুমার শ্রেষ্ঠ জানিয়েছেন।
‘ন্যায়বিচারের সূচনা’
গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদ থেকে বিক্ষোভের সূচনা হয়, যা পরে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক দুর্দশা নিয়ে জনঅসন্তোষে রূপ নেয়।
পরদিনই তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে; সংসদ ও সরকারি দপ্তরে অগ্নিসংযোগ হয় এবং ওলির সরকারের পতন ঘটে।
ওলির দল সিপিএন-ইউএমএল এই গ্রেপ্তারকে ‘প্রতিশোধমূলক’ আখ্যা দিয়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে।
রোববার রাজধানী কাঠমান্ডুতে আদালতের কাছে ১০০ জনের বেশি সমর্থককে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সড়কে ব্যারিকেড দেয় এবং লাঠিচার্জ করে বলে এএফপি আলোকচিত্রী জানিয়েছেন।
সমর্থকরা ওলির মুক্তি দাবি করে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন।
ওলির সমর্থক তেজিলা থাপা (৪৪) বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তাড়াহুড়া করে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘এটি ভুল সিদ্ধান্ত এবং তা সংশোধন করা উচিত।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং বলেছেন, ওলি ও লেখকের গ্রেপ্তার ‘কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নয়, বরং ন্যায়বিচারের সূচনা।’
র্যাপার থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা ৩৫ বছর বয়সী বলেন্দ্র শাহ এবং তার দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ তরুণ নেতৃত্বভিত্তিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসে। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে তার নিজের নির্বাচনী এলাকাতেই পরাজিত করেন।
শাহর সরকার ১০০ দফা সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে রাজনীতিবিদ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্পদের তদন্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিদ্রোহের আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে নেপালের অবস্থান ছিল ১৮০ দেশের মধ্যে ১০৭তম।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নেপালের মাথাপিছু জিডিপি ছিল মাত্র ১,৪৪৭ ডলার এবং দেশটির ৮২ শতাংশ শ্রমশক্তি অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত।