সানজানা তালুকদার, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম নারীর অবদান সম্পর্কে লিখেছিলেন-
“বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি, চির-কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
এই চিরন্তন পংক্তি নারী ও পুরুষের সমান অবদান ও মর্যাদার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। নারীর অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়নের দাবিকে সামনে রেখে প্রতি বছর ৮ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিনটি শুধু উদযাপনের নয়; বরং নারীদের দীর্ঘ সংগ্রাম, অর্জন এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও স্মরণ করিয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ইতিহাস মূলত বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কর্মক্ষেত্রে ন্যায্য মজুরি, কম কর্মঘণ্টা এবং ভোটাধিকারের দাবিতে নারী শ্রমিকদের আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। ১৯০৮ সালে নিউইয়র্কে বস্ত্রশ্রমিক নারীদের বিক্ষোভ এই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। পরে ১৯১০ সালে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের প্রস্তাবে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে দিনটি বিশ্বব্যাপী পালন শুরু করে।
নারী দিবস উপলক্ষে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) নারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাদের অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা এবং সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন ভাবনা ব্যক্ত করেছেন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শক ড. নাহিদা বেগম বলেন, 'আমি ব্যক্তিগতভাবে নারী দিবসকে আলাদা করে দেখার পক্ষপাতী নই। নারীদের অধিকার ও মর্যাদা তো সব দিনই থাকা উচিত। তবে নারী দিবসের একটি দিক আছে এটি অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত নারীদের প্রতি চলমান বৈষম্য ও অবদমনের বিষয়টিকে সামনে আনে।
নব্বইয়ের দশক থেকে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছিল। কিন্তু এখন নানা উপায়ে সেই অংশগ্রহণ কমিয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে কোনো নারী সফল হলে তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার প্রবণতাও সমাজে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, 'নিম্নবিত্ত শ্রেণির নারীদের সংকট অনেকটাই একই মৌলিক চাহিদা পূরণের সংগ্রাম। উচ্চবিত্ত শ্রেণিতেও খুব বেশি পরিবর্তন নেই। মূলত সমাজের পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে।বর্তমানে নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ধর্ষণ, সাইবার বুলিংসহ নানা সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে, কিন্তু এর কার্যকর প্রতিকার কতটা হচ্ছে, সেটি বড় প্রশ্ন।আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে, আমাদের ক্যাম্পাসের নারীরা অনেক সচেতন এবং সহপাঠী ছেলেরাও তাদের প্রতি বেশ সংবেদনশীল ও সহমর্মী।'
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক আফরোজা আক্তার বলেন, 'নারী দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর প্রকৃত স্বীকৃতি নিশ্চিত করা জরুরি। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, উচ্চশিক্ষা ও জ্ঞানচর্চাই একজন নারীকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন অনুকূল পরিবেশ ও কর্মক্ষেত্রে সহযোগিতা। উৎসাহ নারীর কর্মস্পৃহা বাড়ায়, আর অযাচিত সমালোচনা তা কমিয়ে দেয়।
তিনি আরও বলেন, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আমাদের ব্যথিত করে, যা প্রমাণ করে এখনো অনেক পথ বাকি। তাই শুধু একাডেমিক সাফল্য নয়, নারীদের নীতি-নির্ধারণী ও নেতৃত্বের পর্যায়েও এগিয়ে আসার মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি। কর্মক্ষেত্র ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রেখে নারীরা যে এগিয়ে চলছে, তা সত্যিই অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক।আমরা এমন একটি সমাজ চাই যেখানে পোশাক, ধর্ম বা লিঙ্গ নয়—মেধাই হবে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি। প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে নারীর অংশগ্রহণ তাদের ক্ষমতায়নকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাই নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও পারস্পরিক সম্মান নিশ্চিত করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।'
গনিত বিভাগের স্নাতকোত্তর ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা শান্তা বলেন, 'কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নারী শিক্ষার্থী হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা মিশ্র। এখানে একাডেমিক পরিবেশ, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও বিভিন্ন সংগঠনে কাজ করার সুযোগ আমাকে দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। তবে আবাসন সংকট ও পরিবহন সমস্যার কারণে মাঝে মাঝে ভোগান্তি পোহাতে হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ আবাসন, পর্যাপ্ত স্যানিটেশন, মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং, নিরাপদ পরিবহন, কার্যকর যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বিবাহিত বা মা শিক্ষার্থীদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় নারীদের জন্য বিশেষ স্কলারশিপের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।আন্তর্জাতিক নারী দিবস নারীদের সংগ্রাম ও সাফল্যের কথা মনে করিয়ে দেয় এবং আমাকে সমতা ও মানবিকতার ভিত্তিতে সমাজ গঠনে অবদান রাখতে অনুপ্রাণিত করে।'
ফার্মেসী বিভাগের স্নাতক ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তানজিলা মুবাশ্বারা মৃদুলা বলেন, 'প্রায় তিন বছরের বেশি সময় ধরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পথচলা। একজন নারী শিক্ষার্থী হিসেবে অভিজ্ঞতাটি মিশ্র হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সরাসরি হয়রানির মুখোমুখি হইনি। তবে গর্ভবতী নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহানুভূতি ও বিশেষ বিবেচনার ঘাটতি চোখে পড়ে। তবুও এখানে আমি আস্থা ও স্বীকৃতি পেয়েছি কখনো “তুমি পারবে তো?” এমন সন্দেহের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়নি।'
তিনি আরও বলেন, 'ক্যাম্পাসকে আরও নারী-বান্ধব করতে গর্ভবতী বা বিশেষ স্বাস্থ্যগত অবস্থায় থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য নমনীয় একাডেমিক নীতি, সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং, বিবাহিত বা সন্তানসহ শিক্ষার্থীদের জন্য ডে-কেয়ার সুবিধা, ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রতিটি ফ্যাকাল্টিতে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিনসহ পরিচ্ছন্ন স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।নারী দিবস আমাকে মনে করিয়ে দেয় 'এভরি টাইম আ উম্যান স্ট্যান্ডস আপ ফর হারসেলফ, শি স্ট্যান্ডস আপ ফর অল উইমেন। 'এই ভাবনাই আমাকে নিজের শক্তি ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে এবং সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে অনুপ্রাণিত করে।'
নারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভাবনা থেকে স্পষ্ট নারীর অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়নের পথে এখনো অনেক কাজ বাকি। ক্যাম্পাস ও সমাজে নারীদের নিরাপত্তা, সমান সুযোগ ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষা, নেতৃত্ব ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেই একটি সমতাভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে উঠবে। তাই নারী দিবস কেবল উদযাপনের দিন নয়; বরং সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং নারীর অগ্রযাত্রাকে সমর্থনের এক গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান।