মোতাহের উদ্দিন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিঃ
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে গত ২২ জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করতে এবং রাজনৈতিক বৈধতা তুলে ধরতে অনলাইন ও অফলাইনে নির্বাচনী ইশতেহারভিত্তিক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই প্রচারণার সময়সীমা চলবে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে নির্বাচন আর শুধু মাঠের মিছিল–সমাবেশে সীমাবদ্ধ নেই বরং তা বিস্তৃত হয়েছে ডিজিটাল স্পেসে। তবে এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত হয়েছে এক নতুন ও শক্তিশালী মাধ্যম আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)।
AI (Artificial Intelligence) এমন একটি প্রযুক্তি, যা মানুষের মতো সিদ্ধান্ত নিতে, লেখা ও ভিডিও তৈরি করতে এবং বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। নির্বাচনের ক্ষেত্রে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে নানা ভাবে। রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের বয়স, পেশা, আগ্রহ ও রাজনৈতিক মনোভাব বিশ্লেষণ করে লক্ষ্যভিত্তিক প্রচারণা চালাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই দিয়ে তৈরি লেখা, ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে প্রচারণাকে আরও গতিশীল ও আকর্ষণীয় করা হচ্ছে।
এগুলোই নির্বাচনে এআই ব্যবহারের ইতিবাচক দিক। তবে এর পাশাপাশি রয়েছে কিছু গুরুতর নেতিবাচক দিক, যা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক।
এআই এর সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো ডিপফেক ও ভুয়া তথ্যের বিস্তার। ডিপফেকের মতো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই একজন ব্যক্তির কণ্ঠস্বর বা শারীরিক অবয়ব পরিবর্তন করা যায়। এর মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে অপতথ্য ও গুজব ছড়ানো সম্ভব হয়। যেহেতু এসব কনটেন্ট অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়, তাই সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি গোষ্ঠী নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করে এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও অপপ্রচার চালায়।
এর উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একজন সেনা কর্মকর্তার একটি ভুয়া ভিডিওর কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে ওই কর্মকর্তাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাতে দেখা যায়। আবার আরেকটি ভিডিওতে বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে জায়মা রহমানকে তাঁর বাবার পক্ষে ধানের শীষ প্রতীকে প্রচারণা চালাতে দেখা যায়। পরবর্তীতে নিশ্চিত হওয়া যায়, এই ভিডিওগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা ডিপফেক কনটেন্ট।
বাংলাদেশে সাধারণভাবে ডিজিটাল সাক্ষরতার হার তুলনামূলক কম হওয়ায় মানুষ এসব বানোয়াট কনটেন্টে সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছে। এর ফলে নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় ভুয়া তথ্য জনমত গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে, যা গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি।
তাহলে করণীয় কী?
এআই-এর এই ডিজিটাল যুগে নিরাপদ থাকতে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও জনসচেতনতার পাশাপাশি কার্যকর আইন প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি। যাতে ভুয়া কনটেন্ট নির্মাতারা আইনের আওতায় আসে এবং ভবিষ্যতে এমন অপব্যবহার রোধ করা যায়।
বাংলাদেশের এআই-সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের আগে আন্তর্জাতিক কিছু উদ্যোগের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
এআই-এর ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মাইক্রোসফট, গুগল, মেটা এবং ওপেনএআইসহ ২০টি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘টেক অ্যাকর্ড’ নামে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যেখানে নির্বাচনে এআই-এর ক্ষতিকর ব্যবহার রোধে কাজ করার অঙ্গীকার করা হয়।
এ ছাড়া ‘C2PA স্ট্যান্ডার্ড’ নামে একটি ডিজিটাল জলছাপ বা কনটেন্ট ক্রেডেনশিয়াল ব্যবস্থা চালু হয়েছে, যার মাধ্যমে কোনো ছবি বা ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি কি না, তা শনাক্ত করা যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ‘EU AI Act’ আইন পাস করেছে, যেখানে রাজনৈতিক প্রচারণায় এআই-এর ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এআই-এর নেতিবাচক প্রভাব কমাতে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। ডিপফেক ও ভুয়া তথ্য ছড়ানো রোধে কঠোর আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টে বাধ্যতামূলকভাবে ‘AI Generated’ ট্যাগ বা ডিজিটাল জলছাপ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে শক্তিশালী ফ্যাক্ট-চেকিং ইউনিট গঠন করতে হবে, যাতে ভুয়া তথ্য দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিহত করা যায়। ভোটারদের শেখাতে হবে কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়। “সবার আগে সত্যতা যাচাই”এই বার্তাকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি মেটা, গুগল বা এক্সের মতো প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকেও নির্বাচনের সময় অপপ্রচার রোধে আরও দায়বদ্ধ ভূমিকা পালন করতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্বাচনী ব্যবস্থায় একদিকে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে সৃষ্টি করেছে নতুন হুমকি। এই প্রযুক্তিকে পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই, আবার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সঠিক নীতিমালা, দায়িত্বশীল গণমাধ্যম এবং সচেতন নাগরিক এই তিনের সমন্বয়ই পারে এআইকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি নয়, বরং একটি সহায়ক শক্তিতে রূপ দিতে।