মোবাইল, ওয়ালেট হারানো ও অনলাইন প্রতারণা ঠেকাতে বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবন

আরিফ হোসেন, ঝিনাইগাতী প্রতিনিধি:

বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন, ওয়ালেট কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র হারানো এবং ডিজিটাল স্ক্যামের শিকার হওয়া অনেকের জন্যই বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বিষয়ে পোস্ট দেওয়া হলেও তথ্যের সত্যতা যাচাই ও দ্রুত সমাধান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় কার্যকর সমাধান নিয়ে এগিয়ে এসেছেন মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী।

মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সাইবারজায়ায় (ইউওসি) অধ্যয়নরত দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর উদ্যোগে তৈরি হয়েছে কমিউনিটিভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘অ্যাওয়ার এক্সওয়ান’ (AwareXone)। হারানো জিনিস খুঁজে পাওয়া এবং ডিজিটাল স্ক্যাম সম্পর্কে আগাম সতর্কতা তৈরি করাই এই প্ল্যাটফর্মের মূল লক্ষ্য।

অ্যাওয়ার এক্সওয়ানের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার শানাজ শুভন জানান, জিনিস হারানো বা স্ক্যামের শিকার হওয়ার পর মানুষ সাধারণত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দেয়। কিন্তু সেসব তথ্য দ্রুত হারিয়ে যায় এবং যাচাই করাও কঠিন হয়। এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার জন্যই একটি কাঠামোবদ্ধ, নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর ডিজিটাল সিস্টেম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, স্ক্যামের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—মানুষ প্রতারিত হওয়ার পর বিষয়টি বুঝতে পারে। আগে থেকে সতর্ক করার মতো কার্যকর কোনো প্ল্যাটফর্ম না থাকায় অনেকেই আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। অ্যাওয়ার এক্সওয়ান সেই শূন্যস্থান পূরণ করতেই কাজ করছে।

প্ল্যাটফর্মটির কারিগরি উন্নয়ন ও রিপোর্টিং সিস্টেমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন উক্যখিং মারমা জয়। তার তত্ত্বাবধানে তৈরি ডেটা স্ট্রাকচার ব্যবহারকারীদের জন্য হারানো বা পাওয়া জিনিসের তথ্য যুক্ত করা এবং স্ক্যাম সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করা সহজ করেছে। পাশাপাশি ওয়েবসাইট অ্যাডমিন প্যানেল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন তৌহিদুল ইসলাম রুকন। তারা দুজনই একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলর ইন ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইটি) প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত।

এটি একটি সম্পূর্ণ কমিউনিটি-চালিত প্ল্যাটফর্ম। এখানে ব্যবহারকারীরা হারানো কিংবা খুঁজে পাওয়া জিনিসের বিস্তারিত তথ্য যুক্ত করতে পারবেন। পাশাপাশি স্ক্যাম সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করার মাধ্যমে অন্যদের জন্য আগাম সতর্কবার্তা তৈরি হবে। পরিচয় যাচাইকরণ ও কমিউনিটি ভ্যালিডেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাও নিশ্চিত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে অ্যাওয়ার এক্সওয়ানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষজ্ঞ বিভাগের প্রধান (হেড অব সোশ্যাল মিডিয়া এক্সপার্ট) শাওন আহাম্মেদ বলেন, ‘বর্তমানে ভুয়া তথ্য ও গুজব খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা মানুষকে আরও বিভ্রান্ত করে। অ্যাওয়ার এক্সওয়ান এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে যাচাইকৃত তথ্য ও বাস্তব অভিজ্ঞতা এক জায়গায় পাওয়া যাবে। এতে ব্যবহারকারীরা শুধু সচেতনই হবেন না, বরং একটি দায়িত্বশীল ডিজিটাল কমিউনিটির অংশ হতে পারবেন।’

উদ্যোক্তাদের মতে, অ্যাওয়ার এক্সওয়ান কেবল একটি রিপোর্টিং টুল নয়; বরং এটি তথ্যের দীর্ঘমেয়াদি ও সুসংগঠিত আর্কাইভ হিসেবেও কাজ করবে। প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও দুই বাংলাদেশি তরুণের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে হারানো জিনিস উদ্ধার ও ডিজিটাল স্ক্যাম প্রতিরোধে কার্যকর সমাধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তারা আশাবাদী।

উল্লেখ্য, অ্যাওয়ার এক্সওয়ানের অন্যতম উদ্যোক্তা শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার মো. শাহরিয়ার শাহনাজ শোভন। অনলাইনে তিনি ‘shuvonsec’ নামে পরিচিত। নাসা, সনি, মেটা, অ্যামাজন ও গুগলের মতো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে গুরুত্বপূর্ণ সাইবার দুর্বলতা শনাক্ত করে তিনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাইবারজায়ায় তথ্যপ্রযুক্তিতে ডিপ্লোমা অধ্যয়নরত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *